ড. মুহাম্মদ হান্নান তার ’বাঙালীর ইতিহাস’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, ধর্মিয় তথ্য অনুযায়ী- হযরত নূহ (আ:) এর মহাপ্লাবনের পর বেঁচে যাওয়া চল্লিশ জোড়া নর-নারীকে বংশ বিস্তার এবং বিশ্বব্যপী বসতি গড়ার লক্ষ্যে বিভিন্ন স্থানে প্রেরণ করা হয়েছিলো। নূহ (আ:) এর পূত্র ‘হাম’ পিতার নির্দেশে এশীয় অঞ্চলে আসেন। হাম এর পূত্র হিন্দ এর নামানুসারে হিন্দুস্থান, সিন্দ এর নামানুসারে সিন্ধুর নামকরণ করা হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। হিন্দের সন্তান ‘ বঙ্গ’ ভারতের পূর্বাঞ্চলে বসতি স্থাপন করেন। ’বঙ্গ’ - এর নামানুসারে এ স্থান বঙ্গদেশ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। বঙ্গ - িএর সন্তানরাই বাঙাল বা বাঙালি নামে পরিচিত।

[নূহ (আ:) >> হাম >> হিন্দ >> বঙ্গ >> বঙ্গদেশ]

বঙ্গ (ব্যক্তি) >> আহাল (সন্তান) >> বাঙ্গাহাল >> বাঙ্গাল >> বাঙাল>> বাঙালি

বাঙালি জাতির মূল কাঠামো সৃষ্টির কাল প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে মুসলমান অধিকারের পূর্বপর্যন্ত বিস্তুৃত। সমগ্র বাঙালি জনগোষ্ঠিকে দু’ভাগে ভাগ করা যায়-

  • প্রাক আর্য বা অনার্য নরগোষ্ঠি
  • আর্য নরগোষ্ঠি

আর্যপূর্ব জনগোষ্ঠি মূলত চার শাখায় বিভক্ত - নেগ্রিটো, অস্ট্রিক, দ্রাবিড় ও ভোটচীনীয়।
অস্ট্রো এশিয়াটিক বা অস্ট্রিক গোষ্ঠি থেকে বাঙালি জাতির প্রধান অংশ গড়ে উঠেছে বলে ধারণা করা হয়।  এদের  ‘ নিষাদ জাতি’ নামেও অভিহিত করা হয়।

প্রায় পাঁচ - ছয় হাজার বছর পূর্বে  ইন্দোচীন থেকে বাংলায় প্রবেশ করে অস্ট্রিক জাতি নেগ্রিটোদের পরাজিত করে। অস্ট্রিক জাতির সমকালে বা কিছু পরে দ্রাবিড় জাতি খাইবার গিরিপথ দিয়ে আসে এবং সভ্যতার উন্নততর বলে তারা অস্ট্রিক জাতির উপর প্রভাব বিস্তার করে। অস্ট্রিক ও দ্রাবিড় জাতির সংমিশ্রণে সৃষ্টি হয়েছে আর্যপূর্ব বাঙালি জাতি। প্রায় পাঁচ হাজার বছর পূর্বে উত্তর-পূর্বাঞ্চল দিয়ে মঙ্গোলীয়দের আগমন ঘটে। তবে বাংলা ভূখন্ডে আর্যীকরণের পরে মঙ্গোলীয় বংশোদ্ভূত জনগোষ্ঠি সমতলভূমির ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পাহাড়ি অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়লেও বাঙালির রক্তের সঙ্গে এদের মিশ্রণ উল্লেখযোগ্য নয়। গারো, কোচ, চাকমা, ত্রিপুরা প্রভৃতি উপজাতি এ জনগোষ্ঠিভুক্ত।

ইতিহাসে এই তথ্য মেলে যে, খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ অব্দে আফগানিস্থানের খাইবার গিরিপথ দিয়ে কাকেশীয় অঞ্চলের শ্বেতকায় আর্যগোষ্ঠী ভারতবর্ষে প্রবেশ করে। উপমহাদেশে আগমনের অন্তত চৌদ্দশত বছর পরে খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতকে বঙ্গ ভূখণ্ডে আর্যদের আগমন ঘটে। এদেশে আর্যদের আগমনের পূর্বে  এ অঞ্চলে স্থানীয় অন্ত্যজ সম্প্রদায়ের বসবাস ছিল। নৃতাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণের দিক থেকে এর অস্ট্রিক নামে পরিচিত। অনার্য ভাষাভাষী এ অন্ত্যজ সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ডোম, চণ্ডাল, হাড়ি, কোল প্রভৃতি। আর্যগণ স্থানীয় অন্ত্যজ সম্প্রদায় তথা অস্ট্রিক জাতি হতে সংস্কৃতি ও সভ্যতায় ছিল উন্নত। তাই স্থানীয় অধিবাসিগণ আর্যদের ভাষা, আচরণ, রীতিনীতির দ্বারা প্রাভাবিত হয়েছিল। স্থানীয় অধিবাসিদের সাথে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে আর্যগণ সাফল্য লাভ করে এবং বঙ্গ ভূখণ্ড দখল করে নেয়। পরবর্তীতে এর স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সাথে মিশে যায়। এভাবে আর্য ও অনার্য আদিম অধিবাসিদের সংমিশ্রণে এর নতুন মিশ্য জাতির উদ্ভব ঘটে।

মৌর্যদের বিজয় থেকে শুরু করে গুপ্তবংশের শাসনকাল পর্যন্ত সুদীর্ঘ আটশত বছর বঙ্গ ভূখণ্ডে আর্যকরণ ঘটে। এ সময়ে এদেশে আর্যভাষা ও সংস্কৃতি দৃঢ়মূল হয়। খ্রিস্টীয় অষ্টম শতাব্দীতে সেমীয় গোত্রের আরবীয়গণ ঘর্মপ্রচার ও বাণিজ্যের মাধ্যেমে বাঙালি জাতির সঙ্গে সংমিশ্রিত হয়। এ সময় নেগ্রিটো রক্তবাহী হাবশী ছাড়াও তুর্কি, আরবীয়, হরানি, আফগান ও মোগলগণ এ ভুখণ্ডে সংমিশ্রিত হয়।

কাজেই বর্তমান বাঙালি জাতি অস্ট্রিক, দ্রাবিড়, আর্য, মঙ্গোলীয়, সেমীয়, নিগ্রো ইত্যাদি বিভিন্ন জাতির রক্তধারায় এক বিচিত্র জনগোষ্ঠি রুপে গড়ে ওঠে। পরবর্তীতে এর সাথে ইউরোপীয় জনগোষ্ঠীও মিশে যায়। ‘ বাংলার ইতিহাসের ধারা ‘ গ্রন্থে ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত দেখিয়েছেন, বাঙালির রক্তের মধ্যে ঘাট ভাগ অস্ট্রেলীয়, বিশ বাগ মঙ্গোলীয়, পনের ভাগ নেগ্রিটো, এবং পাঁচ ভাগ অন্যান্য নরগোষ্ঠীর রক্ত মিশেছে। নিষাদ, কোল , ভাল, মুণ্ডা, সাঁওতাল, সরব, পুলিন্দ, মালপহাড়ি, প্রভৃতি হচ্ছে অপেক্ষাকৃত স্বল্প সংকর আদি অস্ট্রেলীয় বা ভেড্ডি। আর কিরাত, রাশবংশী, নাগা, কোচ, মেচ, মিজ্জার, কুকি, চাকমা, আরাকানী, প্রভৃতি হচ্ছে স্বল্প সংকর মঙ্গোলীয়। এর সঙ্গে গৌড়, মালব, চৌড়, শক, হুন, কুলিক, কর্ণাট, লাট, দ্রাবিড়, মূণ্ডা, কৃষাণ, ইউচি, আরব, ইরানি, হাবশি, গ্রিাক, তুর্কি, আফগান, মোগল, পর্তুগীজ, ওলন্দাজ, ফরাসি ও ইংরেজদের রক্ত মিশেছে এ সংমিশ্রনের মাধ্যমে ভিন্ন বৈশিষ্ট্য নিয়ে বাঙালি জাতি গড়ে উঠেছে।

বাংলা জাতির উদ্ভব সম্পর্কে পরীক্ষায় আসা নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্ন

১। সর্বপ্রথম বঙ্গ নামের উল্লেখ পাওয়া যায় কোন গ্রন্থে?
উ: ঐতরেয় অরণ্যক
২। আর্যগণ কবে প্রথম বঙ্গ ভূখণ্ডে আগমন করেন?
উ: খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম শতকে
৩। তৎকালে বঙ্গ বলতে কোন অঞ্চলকে বির্দেশ করা হত?
উ: উত্তর ও পশ্চিমবঙ্গ
৪। বং বা বঙ গোষ্ঠীর মানুষের বাস কোথায় ছিল?
উ: ভাগীরথী নদীর তীরে।
৫। অস্ট্রিক-দ্রাবিড় জাতির সাথে কোন জাতির সংমিশ্রণে বাঙালি জাতি গড়ে উঠেছে?
উ: আর্য জাতি
৬। বাংলা নামের উৎপত্তি সম্পর্কে কোন গ্রন্থে উল্লেখ আছে?
উ: আইন -ই- আকবরী
৭।  বাঙালি জাতিকে কয় ভাগে ভাগ করা যায়?
উ: দুই ভাগে
  • প্রাক আর্য বা অনার্য নরগোষ্ঠি
  • আর্য নরগোষ্ঠি
৮। আর্যদের কয় ভাগে ভাগ করা হয়?
উ: চার ভাগে
আর্যপূর্ব জনগোষ্ঠি মূলত চার শাখায় বিভক্ত - নেগ্রিটো, অস্ট্রিক, দ্রাবিড় ও ভোটচীনীয়।
৯। কোন গোষ্ঠী থেকে বাঙালি গোষ্ঠীর উদ্ভব?
উ: অস্ট্রিক
১০। আর্যদের আগমনের কারা পূর্বে কারা এদেশে বসবাস করত?
উ: আনার্যরা
১১। নেগ্রিটোদের উৎখাত করে কারা?
উ: অস্ট্রিকরা
১২। বাংলাদেশের প্রাচীত জাতি?
উ: দ্রাবিড়
১৩। আর্য যুগকে বলে?
উ: বৈদিক যুগ
১৪। বেদ কাদের ধর্ম গ্রন্থ?
উ: আর্যদের
১৫। পশ্চিমবঙ্গের আদিম নাম কী?
উ: কর্ণসৃবর্ণ
১৬। আর্য সংস্কৃতি বিকাশ লাভ করে কোন আমলে?
উ: পাল আমলে
১৭। আর্যরা প্রথম কোথায় বসতি স্থাপন করে?
উ: সিন্ধু অঞ্চলে
১৮। বাঙালি জাতি বাংলার বাইরে কি নামে পরিচিত ছিল।
উ: গৌড়িয়া।
১৯। ইংরেজি Bangle শব্দ কোন শব্দ থেকে এসেছে?
উ: ফারসি বাঙ্গালাহ
২০। অস্ট্রিক জাতি বাংলায় প্রবেশ করে?
উ: ১৫০০ বছর পূর্বে।
নবীনতর পূর্বতন